হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই ধারাবাহিক আলোচনাটি “আদর্শ সমাজের দিকে” শিরোনামে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–সম্পর্কিত শিক্ষা ও ধারণাগুলো পাঠকদের সামনে তুলে ধরা।
মাহদাভিয়াত বিষয়ে সুন্নি ও শিয়া মাজহাবের মধ্যে ঐক্যের দিকসমূহ
১. ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের অনিবার্যতা
শিয়া ও সুন্নি উভয় মতেই এটি একটি মৌলিক ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস যে, হজরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাব এবং তাঁর ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক আন্দোলন অবশ্যই সংঘটিত হবে।
এই বিষয়ে উভয় সম্প্রদায়ের হাদিস গ্রন্থসমূহে অসংখ্য বর্ণনা বিদ্যমান, যা এ বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে।
২. ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর বংশপরিচয়
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর বংশধারা ও পরিচয় নিয়ে শিয়া ও সুন্নি উভয় মতের মধ্যে আংশিক ঐকমত্য বিদ্যমান।
শিয়া মত অনুযায়ী, তিনি হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর পবিত্র আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত এবং ইমামতের ধারার শেষ ইমাম।
অন্যদিকে, সুন্নি হাদিসেও একাধিক বর্ণনায় ইঙ্গিত করা হয়েছে যে তিনি আহলে বাইত থেকেই আগমন করবেন।
৩. ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আহলে বাইত থেকে হবেন
ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানে রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন:
الْمَهْدِی مِنَّا أَهْلَ الْبَیتِ یصْلِحُهُ اللَّهُ عَزَّ وَ جَلَّ فِی لَیلَةٍ.
মাহদী আমাদের আহলে বাইত থেকে হবেন, এবং আল্লাহ তাআলা এক রাতের মধ্যে তাঁর (অবস্থা ও দায়িত্বকে) সুসংগঠিত ও পরিশুদ্ধ করে দেবেন।
[ইবনে মাজাহ, সুনান; কাশফুল গুম্মা; দালায়েলুল ইমামাহ]
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে:
یخرج رجل من أهل بیتی عِنْدَ انْقِطَاعٍ مِنَ الزَّمَانِ وَ ظُهُورٍ مِنَ الْفِتَن یکُونُ عَطَاؤُهُ حثیاً.
আমার আহলে বাইত থেকে একজন ব্যক্তি শেষ যুগে, সময়ের অবসান ও ফিতনার বিস্তারের সময়ে আবির্ভূত হবেন। তাঁর দান হবে অত্যন্ত ব্যাপক ও অফুরন্ত।
[ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ; কাশফুল গুম্মা]
৪. শেষ যুগে ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বের আগমন
উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট হয় যে, শেষ যুগে যখন পৃথিবীতে ফিতনা, বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক অবক্ষয় ব্যাপক আকার ধারণ করবে, তখন আহলে বাইতের একজন ন্যায়পরায়ণ নেতা আবির্ভূত হবেন।
তিনি পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন, জুলুম দূর করবেন এবং সমাজে কল্যাণ, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।
আহলে সুন্নাত ও শিয়া উভয় সূত্রে বর্ণিত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–সম্পর্কিত আরও কিছু বর্ণনা ও বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করা হলো:
১. ইমাম মাহদী (আ.ফা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর আহলে বাইত ও তাঁর বংশধর থেকে হবেন
সানআনী তাঁর আল-মুসান্নাফ গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন:
...فَیبْعَثُ اللَّهُ رَجُلًا مِنْ عِتْرَتِی من أَهْلِ بَیتِی...
...অতঃপর আল্লাহ আমার বংশধর ও আহলে বাইত থেকে একজন ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন...
[সানআনী, আল-মুসান্নাফ, খণ্ড ১১, হাদিস ২০৭৭০; তাবরানী, আল-মুজামুল কাবীর, খণ্ড ১০, হাদিস ১০২১৩]
২. ইমাম মাহদী (আ.ফা.) হযরত আলী (আ.)–এর বংশধর থেকে হবেন
এ প্রসঙ্গে জালালুদ্দীন সুয়ুতী তাঁর আল-‘উরফুল ওয়ার্দী গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.)–এর হাত ধরে বলেন,
سیخرج من صلب هذا فتی یمْلأ الأَرْضَ قِسْطاً وَ عَدْلاً.
অর্থ: “এই ব্যক্তির বংশধর থেকে অচিরেই এমন একজন যুবক বের হবেন, যিনি পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পূর্ণ করবেন।”
[সুয়ুতী, আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, আল-‘উরফুল ওয়ার্দী, পৃ. ৭৪, ৮৮]
আরেকটি বর্ণনায় জুয়াইনি শাফেয়ী তাঁর ফারায়েদুস সামতাইন গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন:
إِنَّ عَلِی بْنَ أَبِی طَالِبٍ علیهالسلام إِمَامُ أُمَّتِی وَ خَلِیفَتِی عَلَیهَا بَعْدِی وَ مِنْ وُلْدِهِ الْقَائِمُ الْمُنْتَظَرُ الَّذِی یملا الله به الارض عدلا و قسطا کَمَا مُلِئَتْ ظُلْماً وَ جَوْراً...
অর্থ: “নিশ্চয়ই আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) আমার উম্মতের ইমাম এবং আমার পর তাদের খলিফা। তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকেই হবেন ‘কায়েম’ ও ‘প্রতীক্ষিত ইমাম’, যার মাধ্যমে আল্লাহ পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পূর্ণ করবেন, যেমন তা অন্যায় ও অবিচারে ভরে গিয়েছিল।”
[জুয়াইনি, ফারায়েদুস সামতাইন, খণ্ড ২, পৃ. ৩২৭, হাদিস ৫৮৯; কিতাব: কামালুদ্দীন ও তামামুন নিআমাহ, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৭]
৩. ইমাম মাহদী (আ.ফা.) হযরত ফাতিমা (সা.আ.)–এর বংশধর থেকে হবেন
আহলে সুন্নতের বহু বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা.) হযরত ফাতিমা (সা.)–এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
ইবনে মাজাহ উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
الْمَهْدِی مِنْ وُلْدِ فَاطِمَةَ.
অর্থ: “মাহদী ফাতিমার সন্তানদের মধ্য থেকে হবেন।”
[ইবনে মাজাহ, সুনান; আবু দাউদ, সুনান; নাঈম ইবনে হাম্মাদ, আল-ফিতান; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক]
৪. ইমাম মাহদী (আ.ফা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর নামের সাথে অভিন্ন নামের অধিকারী হবেন
শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে এটি বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর নামের সাথে মিল রেখে নামধারী হবেন।
[মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, পৃ. ৪৫, ৫৫]
৫. আবির্ভাবের পূর্ববর্তী সামাজিক অবস্থা
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীতে কিছু সামাজিক ও নৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে—এ বিষয়টি শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রেই বর্ণিত হয়েছে।
ক. মানুষের চূড়ান্ত নিরাশা
দাউদ ইবনে কাসীর আল-রাক্কী বলেন, তিনি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)–কে জিজ্ঞাসা করেন:
এই বিষয়টি (আবির্ভাব) দীর্ঘায়িত হয়েছে, এমনকি আমাদের হৃদয় সংকীর্ণ হয়ে গেছে...
ইমাম (আ.) বলেন, “যখন মুক্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত নিরাশা সৃষ্টি হবে, তখন আসমান থেকে ‘কায়েম’৷ তথা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর নামে আহ্বান করা হবে।”
[নু’মানী, আল-গাইবা, পৃ. ১৮৬, হাদিস ২৯]
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.)–কে উদ্দেশ করে বলেন: “হে আলী! মাহদীর আবির্ভাব তখন হবে, যখন শহরগুলো পরিবর্তিত হয়ে যাবে, মানুষের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তারা মাহদীর আগমন থেকে সম্পূর্ণভাবে নিরাশ হয়ে যাবে। তখন আমার সন্তানদের মধ্য থেকে ‘কায়েম মাহদী’ আবির্ভূত হবেন।”
[কুন্দুজী, ইয়ানাবীউল মাওয়াদ্দাহ, পৃ. ৫২৮; আল-বিয়ান ফি আখবার সাহিবিয যামান, পৃ. ৪২]
এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায় যে, আহলে সুন্নত ও শিয়া উভয় সূত্রেই ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর বংশ, পরিচয়, আবির্ভাবের পূর্বলক্ষণ এবং শেষ যুগে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ভূমিকা নিয়ে বহু মিল রয়েছে।
যদিও কিছু ব্যাখ্যাগত পার্থক্য বিদ্যমান, তবে মূল আকীদাগত ভিত্তি অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন।
জুলুমের ব্যাপকতা
রাসূলুল্লাহ (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন:
لَوْ لَمْ یبْقَ مِنَ الدُّنْیا إِلَّا یوْمٌ لَطَوَّلَ اللَّهُ ذَلِکَ الْیوْمَ حَتَّی یبْعَثَ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ بَیتِی یمْلَأُ الْأَرْضَ عَدْلًا وَ قِسْطاً کَمَا مُلِئَتْ ظُلْماً وَ جَوْراً...
[আবু দাউদ, সুনান আবি দাউদ, হাদিস ৪২৮২]
অর্থ: যদি পৃথিবীতে মাত্র একদিনও অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ সেই দিনটিকে দীর্ঘ করে দেবেন, যতক্ষণ না তিনি আমার আহলে বাইত থেকে একজন ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন, যিনি পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পূর্ণ করবেন, যেমন তা জুলুম ও অবিচারে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
আবির্ভাবের লক্ষণসমূহ
শিয়া হাদিস গ্রন্থসমূহে ভবিষ্যতের কিছু ঘটনাকে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব লক্ষণকে সাধারণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়—অনিবার্য (হাতমী) এবং অননিবার্য (গাইর হাতমী)। এর মধ্যে কিছু লক্ষণ আহলে সুন্নতের বিভিন্ন সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে।
আসমানী ঘোষণা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“মুহাররম মাসে আকাশ থেকে একটি ঘোষণা শোনা যাবে, যার বক্তব্য হবে—আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি হলেন অমুক (মাহদী), অতএব তাঁর কথা শুনো এবং তাঁর অনুসরণ করো।”
[নাঈম ইবনে হাম্মাদ, আল-ফিতান, পৃ. ৯৩; মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, পৃ. ৭৯, ৮৩, ৯৯; ফারায়েদুস সামতাইন; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৭৩]
হযরত আলী (আ.) বলেছেন, “যখন আকাশ থেকে আহ্বানকারী এমন ঘোষণা দেবে যে সত্য আহলে মুহাম্মাদ (সা.)–এর মধ্যে নিহিত, তখন মাহদী (আ.) আবির্ভূত হবেন।”
[ইবনে মুনাদি, আল-মালাহিম, পৃ. ১৯৬, হাদিস ১৪৩]
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন,
النِّدَاءُ مِنَ الْمَحْتُوم...
আসমানী ঘোষণা অনিবার্য লক্ষণসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
[নু‘মানী, আল-গাইবা, হাদিস ১১]
সুফিয়ানি
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের অন্যতম লক্ষণ হলো “সুফিয়ানি” নামক ব্যক্তির উত্থান। শিয়া হাদিসসমূহে একাধিক বর্ণনায় এটিকে অনিবার্য (হাতমী) আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
[নু‘মানী, আল-গাইবা, পৃ. ২৫৭, হাদিস ১৫; পৃ. ২৬৪, হাদিস ২৬; শাইখ সাদূক, কামালুদ্দীন ও তামামুন নিআমাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৬৫০, হাদিস ৫; তূসী, কিতাবুল গাইবা, পৃ. ৪৩৫]
আহলে সুন্নতের কিছু গ্রন্থেও একে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
[আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৮০; আকদুদ দুরার, পৃ. ৭৬; মুত্তাকী হিন্দী, কঞ্জুল উম্মাল, খণ্ড ১১, পৃ. ২৭৩]
বাইদায় ভূমিধস (খসফ ফি আল-বাইদা)
“খসফ” অর্থ ভূমিতে ধসে পড়া বা মাটির নিচে তলিয়ে যাওয়া। “বাইদা” হলো মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী একটি মরুপ্রান্তর।
এই আলামত অনুযায়ী, সুফিয়ানি একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর বিরুদ্ধে মক্কার দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু তারা যখন মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি “বাইদা” নামক স্থানে পৌঁছাবে, তখন আল্লাহর নির্দেশে তারা ভূমিতে ধসে যাবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
...فَیبْعَثُ إِلَیهِ جَیشٌ من الشام حَتَّی إِذَا کَانُوا بِالْبَیدَاءِ خُسِفَ بِهِمْ...
অর্থ: “তার (মাহদীর) বিরুদ্ধে শাম অঞ্চল থেকে একটি বাহিনী প্রেরণ করা হবে। তারা যখন বাইদা অঞ্চলে পৌঁছাবে, তখন তাদেরকে ভূমিতে ধসিয়ে দেওয়া হবে।”
[সানআনী, আল-মুসান্নাফ, খণ্ড ১১, পৃ. ৩৭১; তাবরানী, আল-মু‘জামুল আওসাত; মুত্তাকী হিন্দী, কঞ্জুল উম্মাল, খণ্ড ১১, হাদিস ৩১৫১৩; আল-বিয়ান; আকদুদ দুরার; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া]
নাফসে জাকিয়া তথা নিরপরাধ ব্যক্তির হত্যা
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের পূর্বে সংঘটিত অন্যতম অনিবার্য আলামত হলো একজন পবিত্র ও নিরপরাধ ব্যক্তির হত্যা, যিনি রুকন ও মাকামের মধ্যবর্তী স্থানে শহীদ হবেন।
[ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, খণ্ড ৮, পৃ. ৬৭৯; মুত্তাকী হিন্দী, কঞ্জুল উম্মাল, খণ্ড ১১, পৃ. ২৭৭; সিউতী, আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৭৮]
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাব সংক্রান্ত বিষয়াবলি
এক রাতেই আবির্ভাবের বিষয় প্রস্তুত হওয়া
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের বিষয়টি আল্লাহর নির্দেশে এক রাতের মধ্যেই প্রস্তুত ও সম্পন্ন হবে। এই বিষয়টি শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রেই উল্লেখিত হয়েছে।
[আল-বিয়ান ফি আখবার সাহিবিয যামান, পৃ. ৩১; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৬৯; আকদুদ দুরার, পৃ. ২১০]
আবির্ভাবের স্থান
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাব কোথা থেকে শুরু হবে এবং তাঁর বিশেষ সঙ্গীরা কোথায় তাঁর সঙ্গে যুক্ত হবেন—এ বিষয়ে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনার সাধারণ বক্তব্য হলো, তাঁর আবির্ভাব মক্কা থেকে শুরু হবে।
[নু‘মানী, আল-গাইবা, পৃ. ৩১৩, হাদিস ৪; পৃ. ৩১৫, হাদিস ৯; মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, অধ্যায় ২, পৃ. ৫৬]
বহু বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর আবির্ভাব কাবার নিকট থেকে শুরু হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ইরাক থেকে কিছু দল এবং শামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইমাম মাহদী (আ.)-এর নিকট আগমন করবে এবং তারা কাবার ‘রুকন ও মাকাম’-এর মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর হাতে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করবে।”
[নাঈম ইবনে হাম্মাদ, আল-ফিতান, অংশ ৪, পৃ. ২৪২, হাদিস ৯৫০]
তিনি আরও বলেছেন: “...কাবার রুকন ও মাকামের মধ্যবর্তী স্থানে ইমাম মাহদী (আ.)-এর হাতে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করা হবে।”
[মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, অধ্যায় ২, পৃ. ৫৬]
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর সাহায্যে ফেরেশতাদের অবতরণ
শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আবির্ভাবের সময় ফেরেশতারা অবতরণ করে তাঁর সাহায্য করবেন।
[আকদুদ দুরার, পৃ. ৪৬, ১১৭, ১৮৫; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৮৮; আল-বিয়ান, পৃ. ৮৪, হাদিস ৫৩]
হযরত ঈসা (আ.)–এর অবতরণ ও ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর পেছনে নামাজ
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো হযরত ঈসা (আ.)–এর অবতরণ। এই ঘটনা বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
یلتفت المهدی و قد نزل عیسی بن مریم کانما یقطر من شعره الماء، فیقول المهدی: تقدم، وَصلِّ بالناس فیقول عیسی بن مریم: انما اقیمت الصَّلاة لک فیصلی عیسی خلف رجل من ولدی...
অর্থাৎ, ইমাম মাহদী (আ.ফা.) দেখবেন যে হযরত ঈসা (আ.) অবতরণ করেছেন, যেন তাঁর চুল থেকে পানি ঝরছে। তখন তিনি তাঁকে সামনে এগিয়ে নামাজ পড়ানোর জন্য বলবেন। হযরত ঈসা (আ.) বলবেন: নামাজ আপনার ইমামতিতে আদায় করার জন্যই স্থাপিত হয়েছে। এরপর তিনি ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর পেছনে নামাজ আদায় করবেন।
[মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, পৃ. ২৯২; আলী ইবনে ঈসা আরবেলী, কাশফুল গুম্মা, খণ্ড ৩, পৃ. ২৭৮]
আরেক বর্ণনায় এসেছে:
...وَ ینْزِلُ رُوحُ اللَّهِ عِیسَی ابْنُ مَرْیمَ فَیصَلِّی خَلْفَهُ...
[শাইখ সাদূক, কামালুদ্দীন ও তামামুন নিআমাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০, হাদিস ১৬]
অর্থ: রূহুল্লাহ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) অবতরণ করবেন এবং তিনি তাঁর (ইমাম মাহদীর) পেছনে নামাজ আদায় করবেন।
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
বহু হাদিস অনুযায়ী, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এই বিষয়টি শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রেই ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে।
[মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস ১৯৪৮৪; সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪২৮২; মু‘জামুল কাবীর তাবারানী, হাদিস ১০২১৯, ১০২২০]
সার্বিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধি
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক আরাম-আয়েশ, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির বিস্তার।
[আল-বিয়ান, পৃ. ৪৩, হাদিস ২২; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৭১; আকদুদ দুরার, পৃ. ১৯৫]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
یکون فی امتی المهدی ... تعیش امتی فی زمانه عیشاً لم تعشه قبل ذلک.
অর্থ: “আমার উম্মতের মধ্যে মাহদী থাকবেন... তাঁর যুগে আমার উম্মত এমন জীবনযাপন করবে যা তারা আগে কখনও করেনি।”
[ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, খণ্ড ৭, হাদিস ১৯৪৮৪]
আরেক বর্ণনায় এসেছে:
یکُونُ فِی أُمَّتِی الْمَهْدِی ... یتَنَعَّمُ فِیهِ أُمَّتِی نِعْمَةً لَمْ یتَنَعَّمُوا مِثْلَهَا قَطُّ.
অর্থ: “আমার উম্মতের মধ্যে মাহদী থাকবেন... তাঁর যুগে মানুষ এমন নিয়ামত ও সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করবে, যা তারা কখনও লাভ করেনি।”
[ইবনে মাজাহ, সুনান, হাদিস ৪০৮৩; আলী ইবনে ঈসা আরবেলী, কাশফুল গুম্মা, খণ্ড ৩, পৃ. ২৫৭]
সর্বজনীন সন্তুষ্টি
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর শাসনামলে সকল মানুষ তাঁর শাসনব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকবে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়টি শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে বর্ণিত।
[সানআনী, আল-মুসান্নাফ, হাদিস ২০৭৭০; আল-বিয়ান, পৃ. ৪২, হাদিস ২১; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৬৯; আকদুদ দুরার, পৃ. ৭৩; ফারায়েদুস সামতাইন, খণ্ড ২, পৃ. ৩১০, হাদিস ৫৬১]
সার্বিক নিরাপত্তা
আবির্ভাব-পরবর্তী যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ও শান্তির বিস্তার।
[মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, পৃ. ২০৭]
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন, “আল্লাহর কসম! তারা (ইমাম মাহদীর অনুসারীরা) এতটা সংগ্রাম করবে যে, পৃথিবীতে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শিরক বিলুপ্ত হবে। এমনকি একজন বৃদ্ধা নারীও পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিরাপদে সফর করবে, কেউ তাকে বাধা দেবে না।”
[তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর, খণ্ড ৮, পৃ. ১৭৯]
মানুষের মধ্যে অভাবমুক্তির অনুভূতি
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর যুগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের অন্তর থেকে অভাববোধ দূর হয়ে যাওয়া এবং ব্যাপক সন্তুষ্টি ও স্বচ্ছলতার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
أُبَشِّرُکُمْ بِالْمَهْدِی ... وَ یمْلَللاً اللَّهُ قُلُوبَ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ غِنًی...
অর্থ: “আমি তোমাদের মাহদীর সুসংবাদ দিচ্ছি... আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)–এর উম্মতের হৃদয়কে অভাবমুক্ত ও সমৃদ্ধ করে দেবেন।”
[আহমদ ইবনে হাম্বল, মুসনাদ, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৭; মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, পৃ. ২১৯; আল-বিয়ান, পৃ. ৬১, হাদিস ৩৮; আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া, পৃ. ৭৬]
ইসলামের অন্যান্য ধর্মের উপর বিজয়
শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে বর্ণিত একটি অভিন্ন বিষয় হলো, আবির্ভাবের যুগে ইসলাম অন্যান্য সকল ধর্মের উপর বিজয়ী হবে।
[আকদুদ দুরার, পৃ. ৯৫]
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর বিশ্বজনীন শাসন
বহু ইসলামী হাদিসে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর শাসনব্যবস্থার সার্বজনীনতা ও বিশ্বব্যাপী বিস্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
... یبایع له الناس بین الرکن و المقام، یردالله به الدین و یفتح له فتوحاً، فلایبقی علی وجه الارض الا من یقول: لااله الا الله.
অর্থ: “রুকন ও মাকামের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর (মাহদীর) হাতে মানুষ বাইয়াত করবে। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করবেন এবং তাঁর জন্য বিজয় দান করবেন। ফলে পৃথিবীর বুকে এমন কেউ অবশিষ্ট থাকবে না যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে না।”
[মাকদিসী শাফেয়ী, আকদুদ দুরার, অধ্যায় ২, শেষের দিকের একটি হাদিস]
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:
إِذَا قَامَ الْقَائِمُ لا تَبْقَی أَرْضٌ إِلا نُودِی فِیهَا شَهَادَةُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَ أَنَّ مُحَمَّداً رَسُولُ اللَّهِ
অর্থ: “যখন কায়েম (ইমাম মাহদী) আবির্ভূত হবেন, তখন এমন কোনো ভূখণ্ড থাকবে না যেখানে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’–এর সাক্ষ্য উচ্চারিত হবে না।”
[আয়্যাশি, তাফসির আল-আয়্যাশি, খণ্ড ১, পৃ. ২০৭, হাদিস ৮১]
উল্লেখযোগ্য বিষয়
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে বহু অভিন্ন বর্ণনা বিদ্যমান।
এই আলোচনা এখানেই শেষ নয়; পরবর্তী অংশে আরও বিষয় উপস্থাপন করা হবে।
গ্রন্থসূত্র: “দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত”, লেখক: খোদামুরাদ সোলাইমান — (সামান্য সম্পাদিত)
আপনার কমেন্ট